যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে ডোনাল্ড ট্রাম্পের শপথ আজ 

যুক্তরাষ্ট্রের
যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট হিসেবে সোমবার (২০ জানুয়ারি) শপথ নিতে যাচ্ছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শপথ নেওয়ার দিন ওয়াশিংটন ডিসিতে ভয়াবহ ঠাণ্ডা পড়তে পারে, আবহাওয়া পূর্ভাবাসে এমন আশঙ্কা থাকায় অভিষেক অনুষ্ঠান দেশটির ক্যাপিটল হিলের কংগ্রেস ভবনের একটি অংশে অনুষ্ঠিত হবে। সেখানেই প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম ভাষণ দেবেন। তার এ ভাষণের প্রতিপাদ্য হবে ‘ঐক্য ও শক্তি’। এদিকে অভিষেক অনুষ্ঠানে অনেক বিশ্বনেতা যোগ দিচ্ছেন। শপথ উপলক্ষে ওয়াশিংটনে সাজ সাজ রব। নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেওয়া হয়েছে পুরো শহর। অন্যদিকে অভিষেক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় ফেরা উদযাপন করতে ইতোমধ্যেই ওয়াশিংটন পৌঁছেছেন ডোনাল্ড ট্রাম্প। শনিবার (১৮ জানুয়ারি) সন্ধ্যায় তিনি ওয়াশিংটন পৌঁছান। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের পাঠানো বিমান বাহিনীর একটি বিমানে করে ট্রাম্প ফ্লোরিডার পাম বিচে অবস্থিত রিপাবলিকান ঘাঁটিতে যান। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী মেলানিয়া, মেয়ে ইভাঙ্কা এবং তার স্বামী জ্যারেড কুশনার। ভার্জিনিয়া শহরতলির ডালস বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর ট্রাম্প ওয়াশিংটনের উপকণ্ঠে ভার্জিনিয়ার স্টার্লিংয়ে তার গলফ ক্লাবে যান। ভার্জিনিয়া ওয়াশিংটন উপকণ্ঠে অবস্থিত। গলফ ক্লাবে আতশবাজি পোড়ানোর মধ্য দিয়ে ট্রাম্পের শপথ গ্রহণ উৎস শুরু হবে। সেখানে কিংবদন্তি শিল্পী এলভিস প্রিসলির অনুকরণকারী লিও ডেজ গানে গানে ট্রাম্প ও পরবর্তী ফার্স্ট লেডিকে স্বাগত জানাবেন। ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন প্রযুক্তি জগতের বেশ কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তিত্ব; যেমন- ইলন মাস্ক, জেফ বেজোস এবং মার্ক জাকারবার্গ। বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন। যদিও ২০২০ সালে বাইডেনের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠানে ছিলেন না ট্রাম্প। অতিথিদের মধ্যে আরো থাকবেন বিল ক্লিনটন, জর্জ ডব্লিউ বুশ, বারাক ওবামাসহ জীবিত সব সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট। এদিকে সমর্থকরা ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন ক্যাপিটাল ওয়ান এরেনার ভেতর বড় পর্দায়, জানিয়েছেন ট্রাম্প। এই ক্যাপিটাল ওয়ান এরেনা হচ্ছে প্রফেশনাল বাস্কেটবল ও হকি ভেন্যু, যার ধারণক্ষমতা মাত্র ২০ হাজার। অভিষেকের পর পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউ থেকে হোয়াইট হাউজ পর্যন্ত মার্চিং ব্যান্ড ও অন্যান্য দলকে নিয়ে যে শোভাযাত্রা হওয়ার কথা, তাও এই স্পোর্টস ভেন্যুতে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। মার্কিন কংগ্রেস ভবন সংশ্লিষ্ট মাঠ থেকে ট্রাম্পের অভিষেক দেখতে এর মধ্যেই দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি সমর্থক টিকিট কেটে রেখেছেন। এখন নতুন পরিস্থিতিতে ওই টিকেটধারীদের কিয়দংশ-ই ক্যাপিটাল ওয়ান এরেনায় ঢুকতে পারবেন। ওই অনুষ্ঠানের ভিড় কীভাবে সামাল দেওয়া হবে সে বিষয়ে রয়টার্স জানতে চাইলে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠান আয়োজক কমিটি তাতে সাড়া দেয়নি। ১৯৮৫ সালের জানুয়ারিতে রোনাল্ড রিগ্যানের দ্বিতীয় অভিষেকের পর এটিই হবে প্রথমবারের মতো কোনো প্রেসিডেন্টের অভিষেক অনুষ্ঠান যা ভবনের ভেতরে অনুষ্ঠিত হবে। এদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানের প্রতিবাদ জানাতে স্থানীয় সময় শনিবার দেশটির রাজধানী ওয়াশিংটন ডিসিতে হাজারো মানুষ বিক্ষোভ করেছেন। যাদের বেশির ভাগই ছিলেন নারী। বিক্ষোভে নারী অধিকার, জাতিগত ন্যায়বিচারসহ নানা বিষয়ে সোচ্চার গোষ্ঠীর কর্মীরাও অংশ নেন। বিক্ষোভকারীদের আশঙ্কা এই নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্টের দ্বিতীয় মেয়াদে তাদের সাংবিধানিক অধিকার ক্ষুণ্ন হতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রে প্রতি চার বছর পরপর মার্কিন প্রেসিডেন্টের অভিষেক অনুষ্ঠান হয়। সেখানে নবনির্বাচিত প্রেসিডেন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। অভিষেকের এ অনুষ্ঠান হয় জমকালো। আমন্ত্রণ পান অনেক অতিথি। থাকে অনেক আয়োজন। অভিষেক অনুষ্ঠানে যে আয়োজনগুলো থাকবে শপথ গ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধান অনুসারে, ২০ জানুয়ারি দুপুরে নতুন প্রেসিডেন্টের মেয়াদ শুরু হয়। সেদিনই নতুন প্রেসিডেন্ট শপথ নিয়ে থাকেন। তবে ২০ জানুয়ারি যদি রবিবার (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) পড়ে যায়, তবে শপথ অনুষ্ঠান এক দিন পরে হয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মার্কিন প্রেসিডেন্টরা ক্যাপিটলের ওয়েস্ট লনে স্থাপিত অস্থায়ী প্ল্যাটফর্মে শপথ নিয়েছেন। সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি শপথ অনুষ্ঠান পরিচালনা করে থাকেন। সোমবার ট্রাম্পকে শপথবাক্য পাঠ করাবেন প্রধান বিচারপতি জন রবার্টস। এ নিয়ে তিনি দ্বিতীয়বারের মতো ট্রাম্পকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ পড়াবেন। অভিষেক অনুষ্ঠানে নতুন প্রেসিডেন্ট বক্তব্যও দিয়ে থাকেন। ওই বক্তব্যে তিনি আগামী চার বছরে কী কী করার পরিকল্পনা করছেন, তার একটি রূপরেখা উপস্থাপন করেন। সোমবার ট্রাম্পের সঙ্গে তার ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও শপথ নেবেন। দুই লাখের বেশি টিকিট বণ্টন ট্রাম্পের অনুষ্ঠানে বিশ্বনেতা, শীর্ষস্থানীয় ধনকুবেরসহ অনেক খ্যাতনামা ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। এ ছাড়া আইনপ্রণেতাদের কার্যালয় থেকে শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দুই লাখ ২০ হাজারের বেশি টিকিট বিতরণ করা হয়। তবে যারা ওই টিকিট পাননি, তাদেরও হতাশ হওয়ার কিছু নেই। ন্যাশনাল মল থেকে বিশালাকারের ভিডিও স্ক্রিনে হাজারো মানুষ ওই শপথ অনুষ্ঠান দেখতে পারবেন। অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর ক্যাপিটল থেকে হোয়াইট হাউসে যাওয়ার রাস্তা পেনসিলভানিয়া অ্যাভিনিউতে প্যারেড দিয়ে যাওয়ার সময় জনসাধারণ ট্রাম্পকে একনজর দেখতে পাবেন বলে মনে করা হচ্ছে। নির্বাহী আদেশে স্বাক্ষর শনিবার ওয়াশিংটন রওনা হওয়ার আগে টেলিফোনে এনবিসি নিউজকে একটি সাক্ষাৎকার দেন। সেখানে তিনি বলেন, সোমবার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান শেষে দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিনই তিনি রেকর্ডসংখ্যক নির্বাহী আদেশে সই করবেন। যদিও ঠিক কতগুলো আদেশে সই করবেন, তা এখনো ঠিক করা হয়নি বলে জানান তিনি। তবে সেটি রেকর্ডসংখ্যক হবে। ট্রাম্পকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, সংখ্যাটি ১০০ পার করবে কিনা। জবাবে তিনি বলেন, সংখ্যাটি অন্তত এমনই হবে। ট্রাম্প যেসব নির্বাহী আদেশে সই করবেন, তার অনেকগুলোই বিদায়ী প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন প্রশাসনের গৃহীত নীতি বাতিল করতে করা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ট্রাম্প তার নতুন মেয়াদের প্রথম দিন থেকে যেসব কর্মসূচি গ্রহণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তার মধ্যে গণবিতাড়ন কর্মসূচিও রয়েছে। ট্রাম্প এনবিসি নিউজকে বলেন, অবৈধ অভিবাসীদের বিতাড়ন কর্মসূচি খুব, খুবই দ্রুত শুরু হবে। এনবিসি নিউজকে ওই সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প আরো বলেন, কোন কোন শহরে হবে আমি এখনই তা বলতে পারছি না। কারণ, সবকিছু ছড়িয়ে পড়ছে। এবং এটি আমরা বলতে চাই বলেও আমার মনে হয় না। আপনি এটি সরাসরি দেখতেই পাবেন। সংগীত আয়োজন ২০১৭ সালে প্রথম মেয়াদে ট্রাম্পের অভিষেকের সময় তারকাদের উপস্থিতি কম ছিল। কারণ, বিতর্কিত রিয়েলিটি তারকা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ট্রাম্পের শপথ অনুষ্ঠানে অংশ নিতে ইচ্ছুক কোনো প্রথম সারির তারকাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। তবে দ্বিতীয় মেয়াদে ট্রাম্পের অভিষেক অনুষ্ঠানে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। এ অনুষ্ঠানে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী ক্যারি আন্ডারউড ‘আমেরিকা দ্য বিউটিফুল’ গানটি গাইবেন। মার্কিন সংগীতশিল্পী লি গ্রিনউডও ওই অনুষ্ঠানে গান গাইবেন। তার গাওয়া দেশাত্মবোধক গান ‘গড ব্লেস দ্য ইউএসএ’ ট্রাম্পের নির্বাচনী প্রচারে ব্যবহার করা হয়েছে। গালা অনুষ্ঠান প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ গ্রহণের পর সোমবার রাতে তিনটি আনুষ্ঠানিক গালা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে। অনুষ্ঠানের সব কটিতে ট্রাম্প উপস্থিত হবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এ ছাড়া আরো বেশ কিছু পরিকল্পনা আছে। গার্ডিয়ানের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ঐতিহাসিকভাবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান খোলা স্থানে হয়ে থাকে। কিন্তু এবার ওয়াশিংটনে তীব্র ঠাণ্ডার পূর্বাভাস থাকায়, তা বাইরে করা অনিরাপদ হবে। এ কারণে এবার তা কংগ্রেস ভবনের ভেতরে অনুষ্ঠিত হবে। আর্কটিক ব্লাস্টের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে ২০ থেকে ৪০ ডিগ্রি পর্যন্ত কমে যায়, বেড়ে যায় তুষারপাত। বাতাসেও পরিবর্তন আসে। স্থানীয় সময় গত শুক্রবার সন্ধ্যা থেকে ওয়াশিংটনসহ যুক্তরাষ্ট্রের নানা স্থানে আর্কটিক ব্লাস্ট শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের ৫ নভেম্বরের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী কমলা হ্যারিসকে পরাজিত করে ট্রাম্প জয়লাভ করেন। ট্রাম্পের এই ভূমিধস জয় যুক্তরাষ্ট্রের রাজনীতিতে এক স্মরণীয় ইতিহাস হয়ে থাকবে। এর আগে ২০১৬ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে হিলারি ক্লিনটনকে হারিয়ে প্রথম বারের মতো আমেরিকার মসনদে বসেছিলেন ট্রাম্প। আমারবাঙলা/এমআরইউ

Join Telegram

Post a Comment

Previous Post Next Post

Popular Items